তেহরান, ৪ জুন ১৯৮৯:
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শনিবার গভীর রাতে রাজধানী তেহরানের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তাঁর মৃত্যুতে ইরানসহ মুসলিম বিশ্বে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ ও অন্ত্রসংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন খোমেনি। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষরক্ষা হয়নি। রাষ্ট্রীয় বেতার ও টেলিভিশনে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হলে সমগ্র ইরানজুড়ে শোকের আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
ইরান সরকার দেশব্যাপী শোক ঘোষণা করে। তেহরানে আয়োজিত তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। শোকাহত জনতার উপস্থিতিতে তা ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শোকসমাবেশে পরিণত হয়। রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পরবর্তীতে তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে নির্মিত সমাধিস্থলে তাঁকে দাফন করা হয়, যা পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত হয়েছে।
১৯০২ সালে ইরানের খোমেইন শহরে জন্মগ্রহণ করেন রুহুল্লাহ খোমেনি। ধর্মীয় শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তিনি শিয়া ইসলামি চিন্তাধারার একজন প্রভাবশালী আলেম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর শাসনের অবসান ঘটে এবং ইরানে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র। এই বিপ্লবের প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন খোমেনি। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, ইসলামি চিন্তাধারা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে খোমেনির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতীক; সমালোচকদের দৃষ্টিতে ছিলেন এক বিতর্কিত শাসক। তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শ যে বিশ্বমঞ্চে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই।
খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। নতুন নেতৃত্বের অধীনে ইরান কীভাবে তার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শোকবার্তা প্রেরণ করা হয়েছে। বহু রাষ্ট্রনেতা তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন মহলে তাঁর নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে মূল্যায়নও অব্যাহত রয়েছে।
আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুতে ইরানের ইতিহাসে এক যুগের অবসান ঘটল। তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আলোচনায় দীর্ঘদিন স্থান পাবে—সমর্থন ও সমালোচনার মধ্য দিয়েই তিনি থাকবেন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এক অনিবার্য অধ্যায় হয়ে।
